পিআরআইয়ের সংলাপে অর্থ উপদেষ্টা

ই-রিটার্নে শূন্য আয় দেখিয়েছে ৭০% মানুষ

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন বা ই-রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ শূন্য আয় দেখিয়েছি বলে জানিয়েছে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন বা ই-রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ শূন্য আয় দেখিয়েছি বলে জানিয়েছে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) উদ্যোগে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা’ শীর্ষক এক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা বহুবার প্রতিষ্ঠান সংস্কারের চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। দেশে আইন ও বিধিবিধানের প্রতি মানুষের আনুগত্য খুবই কম। এবারের ই-রিটার্নে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ শূন্য আয় দেখিয়েছে। মানুষ যদি আইন মেনে না চলে, যদি প্রকৃত আয়ের বিবরণী না দেয়—তাহলে সরকার কীভাবে কাজ করবে?’

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় পরিসরেই কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রবৃদ্ধির গতি পুনর্গঠন করা। স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশীয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধির গতি এখনো নাজুক রয়ে গেছে। এ কারণেই সামনে এগিয়ে যেতে হলে বিশেষ করে আর্থিক ও রাজস্ব খাতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। কারণ এসব খাত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বিদ্যমান ভঙ্গুরতাগুলো মোকাবেলায় কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। তাই মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাওয়া রাজনৈতিক সরকারকে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে প্রধান সংস্কারগুলোয় সাহসী প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে, যা অনেকটা ১৯৯০-৯১ সালের পরিস্থিতির মতো, যখন স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটেছিল এবং একটি অন্তর্মুখী, কঠোর নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বহির্মুখী, বাজারমুখী অর্থনীতিতে যাত্রা হয়েছিল। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ধাক্কায় প্রবৃদ্ধি কমে এলেও এটি বাংলাদেশের প্রকৃত সক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে না। সংস্কার ছাড়াও বাংলাদেশ ৫-৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, আর প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন হলে ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি সম্ভব।’

সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায়ই ম্যাক্রো ও মাইক্রো পর্যায়ের সংযোগ উপেক্ষিত থাকে এবং সংস্কার অনেক সময় দেশীয় মালিকানার পরিবর্তে আইএমএফের শর্ত দ্বারা পরিচালিত হয়। কার্যকর সংস্কারের জন্য কয়েকটি মূল ক্ষেত্রে মনোযোগ দিয়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন জরুরি।’

অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিন্টন পবকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশাল। সীমিত নীতিগত ভিত্তি সত্ত্বেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ৫-৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। সঠিক সংস্কার হলে ৮-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয়।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় অর্থবহ সংস্কার—বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে—সংস্কার কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান দাবিগুলোর প্রতিফলন।’ শ্রমবাজার নীতির আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সরকারকে মানসম্মত, কর্মমুখী শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিশ্চিত করতে।’

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে এক ত্রিমুখী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে গভীরতর করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং অর্থনীতির পুনর্গঠন—যার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, সময়সীমাবদ্ধ ও সর্বাঙ্গীণ অর্থনৈতিক সংস্কার। বৈদেশিক ও রাজস্ব চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা অত্যাবশ্যক।’

সংলাপে পিআরআইয়ের পরিচালক ড. আহমাদ আহসান, দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও